অনলাইন বিজনেস শুরু করার আগে করণীয় [স্টেপ-বাই-স্টেপ গাইড]

Updated on:
July 26, 2022

তথ্য প্রযুক্তির যুগে আমাদের জীবন যেমন হয়েছে সহজ তেমনি কেটেছে প্রচুর বাঁধা। ইন্টারনেট সমগ্র পৃথিবীকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। বিনোদন ছাড়াও ইন্টারনেট এখন অনেকের জন্য আয়ের প্রধান উৎস। ঘরে বসেই শুরু করা যাচ্ছে ব্যবসা যার কাস্টোমার হতে পারে পুরো পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের যেকোন মানুষ।

অনলাইনে ব্যবসা শুরু করা খুব কঠিন কিছু নয়, আবার একেবারে সহজ এমনটাও নয়। যেকোন ব্যবসা শুরুর আগে কিছু করনীয় থাকে– বিজনেসের প্ল্যান করা কিংবা স্ট্র্যাটেজি সাজানোর মত সুক্ষ্ম কিন্তু অতীব জরুরী বিষয়গুলো প্রায়ই উপেক্ষা করতে দেখা যায় নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে। যার ফলে ব্যবসা শুরুর পরে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দেখা যায় না, কিংবা টিকে থাকাই হয়ে উঠে মুশকিল। আজকে আমরা আলোচনা করব এমনই কিছু করনীয় নিয়ে যা অবশ্যই অনলাইন বিজনেস শুরু করার আগে করণীয়। শুরুতে জেনে নেই কি কি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজনঃ

১. পণ্য/সার্ভিস

২. মার্কেট এনালাইসিস

৩. বিজনেস প্ল্যান

৪. সাপ্লাই চেইন ও ডিস্ট্রিবিউশন

৫. ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়া

৬. প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট

৭. মার্কেটিং এবং সেলস

আসুন এবার বিস্তারিত জানা যাক।

১. পণ্য/সার্ভিস

প্রথমেই ঠিক করুন কোন পণ্য কিংবা সার্ভিস দিয়ে ব্যবসা করবেন। অনলাইনে অগণিত উদ্যোক্তা বিভিন্নরকম পণ্যের কিংবা সার্ভিসের ব্যবসা করছেন, আপনি কি সেল করবেন ঠিক করতে হবে আপনাকেই। কারো দেখাদেখি কিংবা অনুকরণ না করে নিজে যে পণ্যের উপর বিশ্বাস করেন, যে পণ্য নিয়ে আপনার ভালো ধারণা আছে সেটা নিয়েই আগান। চিন্তা করুন আপনার পণ্য আপনি নিজে ব্যবহার করবেন কিনা বা আপনার পরিবার, বন্ধুবান্ধব ব্যবহার করবে কিনা। এই সাধারণ একটি চিন্তা আপনাকে বেশ কনফিডেন্স যোগাবে, সাথে আপনি নিজে বুঝতে পারবেন সঠিক পণ্য নিয়েই আগাচ্ছেন কিনা।

২. মার্কেট এনালাইসিস

কি নিয়ে বিজনেস করবেন ঠিক করলেন, কিন্তু সে পণ্যের চাহিদা কেমন, কারা কিনবে, কতবার কিনবে এধরণের ব্যাপারগুলো নিয়ে স্টাডি করুন। দেখা গেল এমন পণ্য নিয়ে কাজ করছেন যেটার তেমন চাহিদা নেই, কিংবা আপনার পণ্যের টার্গেট কাস্টোমারদের কাছে সেল না করে যার চাহিদা নেই তার কাছে সেল করতে চাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে ব্যবসার গ্রোথ আশানুরুপ হবে না, বরং ব্যর্থ হবার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হবে।তাই মার্কেট বুঝুন ভালো করে। যাদের টার্গেট করছেন কাস্টোমার হিসেবে তাদের সাথে কথা বলুন, সার্ভে করতে পারেন, কম্পিটিটরদের এক্টিভিটি দেখুন, তাদের পেইজ কিংবা গ্রুপে কাস্টোমার কি মতামত দিচ্ছে এবং কি চাচ্ছে মনোযোগ দিয়ে এনালাইসিস করুন,  অন্যের ভুল থেকে নিজে শিখুন।

৩. বিজনেস প্ল্যান

সবচেয়ে বেশি উদ্যোক্তারা যে ভুলটা করে থাকেন তা হল একটি প্রোপার বিজনেস প্ল্যান না করা। কেবল মুখে মুখে কিংবা ধারণা করে নয়, একটি টেমপ্ল্যাট ধরে পুরো বিজনেস প্ল্যানটি লিখুন। এতে কোথায় কি ধরণের গ্যাপ আছে নিজেই বুঝে যাবেন। আসলে একটি বিজনেস প্ল্যান আপনার আইডিয়াকে এমনভাবে সাজিয়ে তুলবে যাতে আপনি বুঝতে পারেন আপনার স্ট্র্যাটেজি কেমন হওয়া উচিৎ, আপনার একটা নির্দিষ্ট টার্গেটে পৌঁছাতে পুরো ওয়ার্ক প্রসেস কেমন হতে হবে। অনেক ভালো বিজনেস আইডিয়া ফেইল করতে পারে শুধুমাত্র সুগঠিত প্রসেস কিংবা স্ট্র্যাটেজি না থাকার কারনে। একটি ভালো বিজনেস প্ল্যান আপনাকে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিসিশন নিতে সাহায্য করবে, মাঝপথে যেন খেই হারিয়ে না ফেলেন তা নিশ্চিত করবে, সাথে আপনার ব্যবসা সম্পর্কে আপনি আরো ভালো ধারণা পাবেন, ফোকাসড থাকতে পারবেন।

৪. সাপ্লাই চেইন ও ডিস্ট্রিবিউশন

পণ্য কোত্থেকে এবং কীভাবে সোর্স করবেন ঠিক করে নিন। চেষ্টা করুন সোর্সিং প্রসেসটা যেন স্মুথ এবং যথাসম্ভব অল্প খরচে করা যায়, এতে প্রোডাক্টে আপনার প্রফিট মার্জিন বাড়বে। পণ্য সোর্স কেবল একটি হলে ব্যাকআপ হিসেবে আরো ২-৩টি সোর্স যোগ করুন। তবে পণ্যের কোয়ালিটি নিয়ে আপোষ করবেন না এক্ষেত্রে। সবসময় এমনভাবে সোর্সগুলোকে রেডি রাখুন যাতে কোনো কাস্টোমারকে খালি হাতে যেতে না হয়।

পণ্য নিজে ম্যানুফাকচার করলে কতটুক ম্যানুফাকচার করতে পারবেন এবং কীভাবে ম্যানুফাকচারিং প্লেস থেকে কাস্টোমারের কাছে পৌঁছাবেন তা ঠিক করুন। ডিস্ট্রিবিউশন খুবই জরুরী অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে। বেকারি পণ্যের ডিস্ট্রিবিউশন প্রসেস ফ্যাশন পণ্যের ডিস্ট্রিবিউশনের মত হবে না। সঠিক পণ্যের জন্য সঠিক ডিস্ট্রিবিউশন প্রসেস ঠিক করুন। অন্যথায় কাস্টোমার স্যাটিস্ফ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। খুব ভালো প্রোডাক্ট, খুব সুন্দর বিজনেস প্ল্যান থাকার পরেও ব্যবসা ফেইল করতে পারে যদি একটি স্ট্রং সাপ্লাই চেইন এবং ডিস্ট্রিবিউশন নিশ্চিত করতে না পারেন। কাজেই সতর্ক থাকুন এমন ছোটখাটো ব্যাপারেও।

৫. ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়া

অফলাইন বিজনেসে আমরা কাস্টোমারকে যেমনটা দোকানে প্রোডাক্ট সেল করি ঠিক তেমনি অনলাইনে কাস্টোমারকে আমরা ওয়েবসাইটে পণ্য সেল করি। ওয়েবসাইটই আপনার ডিজিটাল দোকান। একটি ওয়েবসাইট থাকলে কাস্টোমার আপনাকে যেমন স্মার্ট ভাববেন তেমন আপনার উপর বিশ্বাস বাড়বে। অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে বিশ্বাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর। কিন্তু কথা হল ব্যবসা শুরু করছেন এখনই কি ৪০-৫০ হাজার টাকা খরচ করে ওয়েবসাইট বানাবেন? এটা মোটেও ভালো বুদ্ধি হবে না। বর্তমানে এমন অনেক প্ল্যাটফর্ম আছে যেগুলো দিয়ে নিজেই ইকমার্স ওয়েবসাইট সেটাপ করে নেয়া যায় বাহ্যিক কোনো সহযোগীতা ছাড়াই। যেমন, বণিক অ্যাপ ব্যবহার করে মাত্র ১ মিনিটে মোবাইল ফোন দিয়েই নিজের ওয়েবসাইট বানিয়ে নিন ফ্রীতে। অর্ডার ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে পেমেন্ট, ডেলিভারি এবং ই-কমার্সের যাবতীয় ফিচার মোবাইলেই পেয়ে যাবেন।

তাছাড়া নিজের ব্যবসার জন্য ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামের মত সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে পেইজ খুলে ফেলুন। ওয়েবসাইটটি পেইজে যোগ করে দিন। প্রতিনিয়ত পেইজে কন্টেন্ট দিয়ে একটিভ থাকুন, কাস্টোমারের মেসেজ এবং কমেন্টের রেসপন্স করুন। সাথে নিজের ব্যবসার একটা কমিউনিটি গড়ে তুলুন ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে। এতে আপনার কাস্টোমাররা নিজেদের মতামত আরো সহজে দিতে পারবে, আপনার আপডেট আরো দ্রুত পাবে। কমিউনিটির মাধ্যমে ব্র্যান্ড বিল্ড করা এবং লয়াল কাস্টোমারবেইজ বানানো অনেক বেশি ইফেক্টিভ হতে পারে।

৬. প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট

ব্যবসা পরিচালনা করতে কোনো ধরণের পারমিশন, লিগাল ডকুমেন্ট থাকা আবশ্যকীয় হলে করে ফেলুন। বিজনেস আইডি, ট্রেড লাইসেন্স, TIN কিংবা কোনো পণ্য বিশেষ কাগজ পত্র থাকলে ইন্টারনেট কিংবা নিজে গিয়ে খোঁজ নিয়ে সেরে নিন। চেষ্টা করুন ব্যবসা শুরুর পর যেন জটিলতা এড়িয়ে চলা যায় এবং পূর্ন মনোযোগ ব্যবসায় দেয়া যায়।

৭. মার্কেটিং এবং সেলস

ব্যবসা শুরু করেছেন এখন তো সেলস দরকার। সেলস আনতে মার্কেটিং শুরু করুন। মার্কেটিং মানেই কেবল পোস্ট বুস্ট করা নয়। মার্কেটিংয়ের জন্য প্রসেস ফলো করুন, এক্ষেত্রে কোনো মার্কেটিং ফানেল অনুসরণ করে সেলস জেনারেট করুন। আপনার পণ্য ব্যবহার করবে এমন একটি আদর্শ মানুষের প্রোফাইল বানান, যাকে Ideal Customer Profile(ICP) বলে। আপনার সব মার্কেটিং প্ল্যান এই আইসিপির মানুষের সাথে কতটুক যৌক্তিক বিবেচনা করে সাজান। ওয়েবসাইটে এই আইসিপি থেকে ভিজিট আনুন, ভিজিটরদের রিটার্গেটিং করুন। সোশ্যাল মিডিয়াতে এনগেইজিং পোস্ট করুন, নিজের ব্র্যান্ডকে পরিচিত করে তুলুন। ভাইরালিটির উপর জোর দিন, এতে পেইড প্রমোশনের চাইতে ওয়ার্ড অফ মাউথ বেশি হবে এবং এর মাধ্যমে খুব সহজে কম খরচে বেশি রিচ করতে পারবেন অর্গানিকালি।

প্রথমে একজন কাস্টোমার আনুন, এরপরে ১০ জন, এরপরে ১০০ জন এভাবে টার্গেট সেট করে সেলস স্ট্র্যাটেজি ঠিক করুন এবং সে অনুসারে মার্কেটিং করুন।

সর্বোপরি, ধৈর্য্য ধরে ব্যবসা এগিয়ে নিন। রাতারাতি সাফল্য আসবে না, টার্গেট ধরে ধরে আগাতে হবে। সবসময় নতুন ট্রেন্ড কিংবা নতুন নিয়মের সাথে আপডেটেড থাকার চেষ্টা করুন। কাস্টোমারের কথা শুনুন, তাঁদের মতামতের গুরুত্ব দিন। ব্যবসায় কাস্টোমারই সব।

Launch your online store with Bonik